বৃহস্পতিবার, ১২ জানুয়ারি, ২০১৭

বর্তমান সামাজিক অস্থিরতা ও আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ



এক অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা যেখানে খুন, ধর্ষন প্রতিদিনকার চিত্র। সমাজে অপরাধ যে আগেও ছিলনা তা নয় কিন্তু বর্তমানে অপরাধের হার যেমন বেড়েছে তেমনি তার ধরনেও যোগ হয়েছে ভিন্নমাত্রা। আমরা যখনি কোন আতঙ্কময় ঘটনার বর্ণনা শুনছি, শিউরে যেমন উঠছি তেমনি আবার কিছুদিনের মধ্যেই নতুন কোন ঘটনার ভীড়ে আবার ভুলেও যাচ্ছি। তবে এ বিষয়ে সবাই একমত সমাজে অপরাধের ধরন বদলে গেছে। শিশুদের প্রতি ভয়াবহ নৃশংস অত্যাচার, সেগুলোকে ভিডিও করে আবার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ছেড়ে দেয়া বা মায়ের হাতে সন্তানের মৃত্যুর যে ঘটনাগুলো সম্প্রতি ঘটছে তা এক দশক আগে কেন বছর পাঁচেক আগেও মনে হয় এভাবে দেখা যায়নি। মানুষ যে আর মানুষ নেই, সমাজে কোথাও যে আর নিরাপত্তা নাই এই বিষয়ে বিভিন্ন আলাপ আলোচনায়, চায়ের দোকানের আড্ডায়, স্কুলের সামনের মায়েদের জমায়েতে সবাই একমত পোষণ করছেন। ভবিষ্যৎ-এ আরো কি কি দেখতে হবে সেই শঙ্কা প্রকাশ করছেন, তারপর আবার জীবনের তাগিদে আবার সেই চলমান অসুস্থ প্রতিযোগিতার পিছনেই সবাই ছুটছেন।
বর্তমানে মিডিয়ার কল্যাণে যে কোন ঘটনাই আমরা সহজেই জেনে যাই। অনেক অনেক ঘটনার ভেতরে যে ঘটনাগুলো আমাদের হজম ক্ষমতার বাইরে চলে যায় সেগুলোর সমালোচনার মুখর হয়ে উঠি। সেগুলার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। বনশ্রীতে মায়ের হাতে দুই ফুটফুটে শিশুর মৃত্যুর খবর এখন আমরা ভুলেই গেছি। সেই খবরের পর এরকম আরো কয়েকটি একই ধরনের ঘটনা ঘটে গেছে। এরপর আমরা হয়তো এরকম খবরেও আর বিচলিত হবনা। তনু হত্যার বিচার চাওয়ার রেশ এখনো কিছুটা আছে কিন্তু এরই মাঝে ঘটে গেছে নারী নির্যাতনের আরো বেশ কিছু ঘটনা। জমি নিয়ে বিরোধে মারামারি, কোপাকুপিতে আমরা এখন আর নজর দেই না। ব্লগারসহ বিভিন্ন টার্গেট কিলিং –ও ঘটছে নিয়মিত ব্যবধানে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমনি চলছে ধর্মীয় চরমপন্থিদের আগ্রাসন, তেমনি ঘটছে সামাজিক অবক্ষয়ের অপরাধসমূহ। মিডিয়ার কল্যাণে শুধু আমরা অপরাধ সম্পর্কেই জানতে পারছিনা, অপরাধের কারণসমূহও জানতে পারছি। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর অনেক সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী, অপরাধ বিশেষজ্ঞ তাদের মতামত প্রকাশ করছেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো আমরা আসলে প্রতিরোধমূলক কি পদক্ষেপ গ্রহণ করছি?  এখনই কি সর্বোচ্চ সময় নয় প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ গহণ করার? আর সেজন্য আমরা শুধু কি রাষ্ট্রের দিকেই তাকিয়ে থাকব? পারিবারিক, সামাজিক ভাবে আমাদের কি কোন দায়িত্ব নেই?
এখন আমরা আমাদের পাশের ফ্লাটে কোন জঙ্গি সংগঠন বোমা বানালেও বলতে পারি না কারণ সামাজিকভাবে আমরা বিচ্ছিন্ন। আমাদের সময় কাটে হিন্দি সিরিয়ালে আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ভার্চুয়াল সাইটে, যা কিনা আমাদের সমাজে পরকীয়া, অবাধ যৌনতা আর পারিবারিক সম্পর্কের ভাঙ্গন ধরিয়ে দিচ্ছে। হিন্দী সিরিয়ালেও হয়তো ভালো কিছু ছিলো কিন্তু তা আমরা কোথায় শিখছি? যে কেউ হিন্দী সিরিয়ালগুলো খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন তারা তাদের ধর্মীয় রীতি-নীতিগুলোকে খুব নিঃসংকোচে তুলে ধরছে। হিন্দুদের বিভিন্ন পূজা পার্বণ, আনুষ্ঠানিকতা দিয়েই প্রতিটি সিরিয়ালের প্রতি পর্বের পাঁচ থেকে দশ মিনিট সময় কাটিয়ে দিচ্ছে। যা দেখে দেখে এখন আমাদের সমাজের অনেক মুসলিম মেয়েরাও মঙ্গলসূত্রের অনুকরণে গহনা বানিয়ে থাকেন, সিঁথিতে সিঁদুর পরতে উৎসাহী বোধ করেন বা স্বামীর দীর্ঘায়ুর জন্য কারওয়া চৌথের মত কিছু একটা করতে চান। এসবকিছুই ভিনদেশী সংস্কৃতির প্রভাব যেখানে স্বামীদের মনে হয় অন্যের স্ত্রী সঙ্গে প্রেম থাকাটা এখন সামাজিক মর্যাদার অংশ!  
ভারতের মিডিয়াতে ধর্মীয় আচারের এত প্রাধান্য দেখে মনে হয় তারা তাদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে গর্বিত যেখানে আমার মনে হয় আমরা আমাদের সমাজে আমাদের ধর্মীয় পরিচয় বা মূল্যবোধ নিয়ে অনেকেই খুব লজ্জার ভিতরে থাকি। আন্তর্জাতিক ভাবে মুসলিমদের নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণাও এর কারণ হতে পারে বা আমাদের দেশী মিডিয়াতেও ইতিবাচক প্রচারণা খুবই কম হওয়াটাও একটা বড় কারণ হতে পারে। আমাদের নাটকে বা সিনেমাতে দাড়ি টুপিওয়ালা লোক থাকলেই বুঝতে হবে সে আসলে খারাপ মানুষ, ভং ধরে থাকে। হয় সে নারী নির্যাতনকারী নয় সে পাকিস্তানের সমর্থক। ধর্মীয় চরিত্রের দ্বিমূখী, নেতিবাচক রূপ আমাদের ধর্মীয় মতামত প্রকাশে নিরুৎসাহিত করে তোলে। আমাদের কাছে বুদ্ধিজীবী, প্রগতিশীল মানুষ মাত্রই হলো যাদের ধর্মীয় বিশ্বাস নেই, অন্তত ইসলাম ধর্মে নেইকিন্তু এই ধারণা কতখানি সত্য? কে বলেছে নিজেকে বুদ্ধিজীবী হিসাবে জাহির করতে গেলেই নিজের ধর্মীয় পরিচয় বিসর্জন দিতে হবে বা ইসলাম ধর্মকে নিয়ে সমালোচনাপূর্ণ লেখা লিখতে হবে? ইসলাম বিরোধী লেখা লিখতে পারলেই সে সংস্কৃতমনা, প্রগতিশীল আর বুদ্ধিজীবী কাতারে আর সমর্থনে লিখলেই কূপমুন্ডুক? ধর্মান্ধতা আর ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা যেমন এক হতে পারে না তেমনি ধর্ম বিরোধী কথা বলা বা লিখা প্রগতিশীলতার পরিচয় হতে পারে না।
আমরা তখনি আমাদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হবো যখন আমরা আমাদের ধর্মকে ভালোভাবে জানব। ধর্মান্ধতা আর জীবনযাপনে ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চার পার্থক্য করতে শিখব। বিদেশী সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ না করে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মকে ভালবাসতে জানলে ও দৈনন্দিন জীবনে তা প্রয়োগ করলেই আমরা সামাজিক অবক্ষয়ের ও ধর্মীয় চরম্পন্থার অনেক অপরাধ সম্মিলিতভাবে মোকাবেলা করতে পারব।
ধর্মীয় মূল্যবোধের সঠিক চর্চা আমাদেরকে আরো সহনশীল করে তুলবে যা কি না সমাজে অপরাধ হ্রাস করতে করতে সহায়তা করবে। অপর্যাপ্ত ধর্মীয় জ্ঞানই অলপ বিদ্যা ভয়ংকরীর মতো হয় আমাদের ধর্মের নামে অপরাধী হতে সাহায্য করছে নয় ধর্ম বিমুখ করে তুলছে।  

মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৪

ডিজিটালাইজেশনের মনোসামাজিক প্রভাব



সারা বিশ্বজুড়েই নিত্যনতুন ইলেকট্রনিক্স পণ্যের কদর রয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করার লক্ষ্যে , যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ থেকে সহজতর করার উদ্দ্যেশ্যে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের উদ্ভাবন প্রতিনিয়তই হচ্ছে। একটি মডেল বাজারে আসার পরপরই আবার তার নতুন মডেল বাজারে চলে আসছে। আমরা সবাই সেই নতুন মডেলের পণ্য ক্রয় করে নিজেকে আধুনিক বা আপডেট করে রাখছি।
প্রযুক্তির এই ব্যবহার শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই নয়, রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেও উৎসাহিত করা হচ্ছে। আমাদের বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে যুগোপযোগী পদক্ষেপ। প্রতিটি স্কুলে ছাত্রদের জন্য ইন্টারনেট সুবিধা হাতের নাগালে নিয়ে আসা হচ্ছে, মোবাইলের সিম ফ্রি দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও নানান পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্যকিন্তু আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যে বা আমাদের সমাজে তার কিরূপ প্রভাব পড়ছে তা কি আমরা খেয়াল করছি??
আমাদের ওয়াই জেনারেশন এখন ডিজিটাল জীবন যাপন করে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বারা তাদের নেটওয়ার্ক এখন অনেক বিস্তৃতকিন্তু এখানেও সেই কিন্তু রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো আমাদের সোশ্যালাইজেশনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে না কি আমাদের সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে আমরা আমাদের বেশীরভাগ সময় এখন ভার্চুয়াল জগতেই কাটাই, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। একটি গবেষনায় দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের উদ্বেগে আক্রান্ত করে। সদ্য আপলোড করা ছবিতে কয়টা লাইক পড়ল, কে কি মন্তব্য করল এইসব বিষয়ে ব্যবহারকারীরা উদ্বেগে ভোগেন। মানসিক রোগ সনাক্তকরণে যে মানদন্ডগুলো ব্যবহার করা হয় ডি এস এম (diagnostic and statistical manual)  তার মধ্যে অন্যতমডি এস এম-এর পঞ্চম সংস্করণে ইন্টারনেট এডিকশন, ঘন ঘন সেলফি তোলা ইতিমধ্যেই মানসিক সমস্যা হিসাবে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে।
মানসিক রোগ বা সমস্যা তৈরী করা ছাড়াও আমাদের সমাজে সামগ্রিকভাবে কিরকম প্রভাব পড়ছে তা যদি আমরা খেয়াল করি। আমরা এখন প্রতিনিয়তই প্রতিযোগীতার ভেতর পড়ে যাচ্ছি, অসুস্থ প্রতিযোগীতা। আমাদের এখন স্কুল বয়সী বাচ্চাদের মোবাইল, ল্যাপটপ দরকার হয়। না হলে তারা অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে পড়বে, সেই ভয়ে বাবা মাও কিনে দেন। কথা হচ্ছে এখানেই শেষ হলে কথা ছিল। এই মোবাইল, ল্যাপটপগুলোর আজকে এক মডেল বের হলে কালকে তা পুরানো হয়ে যায়। নতুন মডেলে নতুন নতুন ফিচার যোগ হয়। ফলে পুরানোগুলোর আর আকর্ষণ থাকে না। তাই আবার নতুন মডেল কেনার তাড়না কাজ করে। যাদের টাকা পয়সা আছে কিন্তু সময় নাই তারা সন্তানদের জিনিসপত্র দিয়ে ঠান্ডা রাখেন, যাদের টাকা পয়সা নাই তারা সন্তানদের আবদারে বিব্রত বোধ করেন। পরিবারে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। বাবা মা হন ব্যাকডেটেড যারা নতুন জেনারেশনের চাহিদা বোঝেন না। পরিবারগুলো এখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। প্রত্যেকেই নিজেদের মতো ব্যস্ত, মোবাইল বা ফেসবুক নিয়ে। কারো কারো অস্থিরতা এতো চোখে পড়ার মতো যে তারা এক মুহূর্ত মোবাইল ছাড়া থাকতে পারেন না। কিছু না হলে অকারণেই মোবাইল টিপাটিপি করতে থাকেন। একজন তরুণের সাথে কথা হয়েছিল যার ফেসবুকে বন্ধুর সংখ্যা ১৬০০ কিন্তু তার কমপ্লেইন ছিলো একা একা লাগে, তাকে কেউ ভালোবাসে না। পত্রিকায় পড়েছিলাম আইফোন-৬ কেনার জন্য একজন তার গার্লফ্রেন্ডকে বিক্রি করে  দিয়েছেন। অফিসে ফেসবুক ব্যবহারের জন্য অনেকেই চাকুরী হারাচ্ছেন, ভাঙছে বৈবাহিক সম্পর্কও। পর্ণোগ্রাফীর মাত্রা বেড়েছে আতঙ্কজনকভাবে, আজকে এর ভিডিও প্রকাশ পাচ্ছে তো কালকে তার ভিডিওস্কুলের ছোট ছোট মেয়েদেরও রেহাই নেই!!!
এই উদাহরণগুলো পড়ে হয়তো অনেকেই বলবেন এখানে শুধু প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকগুলোকেই তুলে ধরা হয়েছে। প্রযুক্তি ব্যাবহারের অসংখ্য ইতিবাচক দিক আছে যা হয়তো বলে শেষ করা যাবে না। তা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করার কোন সুযোগই নেই। কিন্তু যে নেতিবাচক বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে তাও ফেলে দেবার মতো নয়। প্রযুক্তির পরিমিত ব্যবহার নেতিবাচক দিকগুলোকে অনেকাংশেই কমিয়ে আনতে পারে। শুধু তাই নয় আমরা প্রতিদিনই যদি নিজেকে কিছুটা সময় দেই, খেয়াল করার জন্য যে আজকের দিনটা কিভাবে ব্যায় করলাম তাহলে হয়তো লক্ষ্য রাখা সম্ভব হবে প্রযুক্তি ব্যবহারে আসক্ত হয়ে পড়ছি কিনা। যা ভালো লাগে শুধু তাই করার দিকে না ঝুঁকে যেটুকু প্রয়োজন সেই সীমা নির্ধারণ করে তা মেনে চলাটাই কঠিন। সারাক্ষণ মোবাইল টিপাটিপি না করে, ইন্টারনেটের জগতে দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় না করে যদি পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধবদের সাথে সময় কাটাই তা আমাদের মনের জগতকে বেশী স্থিতিশীল করে। কোথাও বেড়াতে বা খেতে যাওয়ার উদ্দেশ্য যেন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া না হয়। যখন যেখানে সময় কাটাই তা যেন উপভোগ করতে পারি। মোবাইলে ব্যালেন্স বা মেগাবাইট শেষ হয়ে গেলে তা যেন আমাদের উদ্বেগে আক্রান্ত না করে। সবাই যে গতিতে ছুটছে সেই গতিতে ছোটার তাড়না যেন আমাদের সারাক্ষণ অসুখী করে না রাখে।
প্রযুক্তির ব্যবহার কমিয়ে আনা আমার এই লেখার উদ্দেশ্য ছিল না। আমরা এমন একটা সময় দিয়ে যাচ্ছি এইরকম উদ্দেশ্য থাকলে তা শুধু উইশফুল থিঙ্কিং হিসাবেই রয়ে যাবে। কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহার আমরা কমিয়ে আনতে পারি। নিজেরা সচেতন হলে, নিজেদের পরিবারে, সমাজে একটু সচেতন ভূমিকা রাখলে সবাই মিলে হয়তো  এই অপব্যবহার প্রতিরোধ করা সম্ভব।

শনিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

ভালোবাসতেই যত ভয়



মাইশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে চাকুরীজীবনে প্রবেশ করেছে। বয়স ২৭, দেখতে চলনসই। কিন্তু এখনও একা। ভালোলাগেনি কখনও কাউকে তেমন নয়, ভালোলাগার কথা বলা হয়নি। ভালোলাগার কথা বলেনি যে কেউ তেমনও নয়, ভালোবাসার সম্পর্কে নিজেকে জড়ানো হয়নি। পড়শোনায় বুদ্ধিমতি, লক্ষ্মী, বাধ্যগত মেয়ে হিসাবে মাইশার পরিবারে সুনাম আছে। সেই সুনাম ধরে রাখার জন্য সবসময়ই একটা মানসিক চাপ বোধ করে। মাইশার ছোটবেলাতেই তার বাবা মাকে ছেড়ে চলে যায়। মাইশা তার মার সাথে নানাবাড়ী থাকে। লক্ষ্মী মেয়ে হিসাবে সুনাম ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টার সেটাও একটা কারণ। মাইশার কেবলই মনে তার যে কোন ভুলকেই তার বাবা মার ডিভোর্সের ব্যাপারটিকে তুলে ধরবে, যে বাবা মা আলাদা থাকে বলে ছেলেমেয়ে ঠিকমতো মানুষ হয়নি! তাই ভুল করার ঝুঁকি মাইশা কখনই নিতে চায়না। কাউকে ভালো লাগলে, কোন সম্পর্কে জড়ালে তার ফলাফল কেমন হবে তার হিসাবটা অংকের মতো সুনির্দিষ্ট নয় বলে এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে চায়না। কখনও একা লাগেনা তা না, অস্থির লাগেনা তা না, কখনো যে মনে হয়না যে পৃথিবীতে কেউ তাকে ভালোবাসেনা তাও না, কিন্তু এই অনুভূতিগুলোর কথা মাইশা কাউকে বলতে পারেনা। কাউকে ভালবাসলে হয়তো আরো বেশী কষ্ট পেতে পারে, ভালোবাসার মানুষ তাকে ছেড়েও চলে যেতে পারে এই ভয়ে মাইশা যে কোন সম্পর্কের হাতছানি থেকেই দূরে সরিয়ে নেয়। চাকুরী, ক্যারিয়ারের দিকে মনযোগী হয়। তাই অন্যদের চোখে মাইশা অ্যাম্বিশাস ও প্রাক্টিক্যাল একজন মানুষ। যার ফলে ভালো লাগার কথা বলা মানুষদের সংখ্যাও কমে যেতে থাকে, মাইশা আরো বেশী একা হয়ে যেতে থাকে।”

হয়তো খুব বেশী নয় কিন্তু মাইশার মতো অনেকেই আছেন যারা ভালোবাসতে ভয় পান। আমার এই অল্প দিনের অভিজ্ঞতাতেই এইটুকু দেখার সুযোগ হয়েছে যে আবেগীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগের সহজ বহিঃপ্রকাশ আসলে কতটা কঠিন!

কোথাও পড়েছিলাম দেশের জনগণকে ভালোবাসা সহজ কিন্তু প্রতিবেশীকে ভালোবাসা কঠিন! তার মানে হচ্ছে অনেক মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা সহজ হলেও নির্দিষ্ট কারো প্রতি ভালোলাগা বা ভালোবাসা প্রকাশ করা কঠিন। সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অনেক রকম হিসেব নিকেশ কাজ করে। অনেকেই প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে অনুভূতির কথা প্রকাশ করতেই ভয় পান, আবার অনেকেই আছেন যারা সম্পর্কের ভেতরেও নিয়ন্ত্রণ হারাবার আতংকে থাকেন। তারা ভালোবাসতে ভয় পান। মনে করেন সঙ্গী যদি বুঝে ফেলে যে তিনি বেশী দুর্বল তার প্রতি তাহলে হয়তো বেশী সুযোগ নিবে বা কোন কারণে সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলে অনেক বেশী কষ্ট পাবেন! এই ভয় শুধু বিয়ের আগেই নয় বিয়ের পরেও অনেক দম্পতির ভিতরে কাজ করে। একবার এক ক্লায়েন্ট আমাকে তার স্ত্রী সম্পর্কে বলছিলেন। যখন আমি তার কাছে জানতে চাইলাম তিনি তার অনুভূতির কথা তার স্ত্রীকে বলেছেন কিনা। তখন তিনি বললেন “না বলি নাই। বললে তো বুঝে যাবে যে ওরে ছাড়া আমি থাকতে পারবনা। তখন নিজের জিদ বেশী রাখব, আমার কথা শুনতে চাইবনা”।

কেউ কেউ আবার সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে ভয় পান। তার পেছনেও অনেক সময় পরবর্তীতে কষ্ট পাওয়ার ভয় বা ভালোবাসলে বেশী ভালোবাসার ভয় কাজ করে। কেউ কেউ হয়তো একবার কষ্ট পেয়েছেন সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েছেন এরপর আর কাউকে মন দিয়ে ভালোবাসবেন না! বা তেমন সিরিয়াসলি সম্পর্কে জড়াবেন না! সেক্ষেত্রে এই জাতীয় কথাগুলো খুব বেশী শোনা যায়- 

“সত্যিকার ভালোবাসছিলাম, বুঝলনা। চলে গেল। তখন থেকেই ঠিক করছি আর কাউকে সিরিয়াসলি ভালোবাসব না। ধরব আর ছাড়ব”। বা
“ছেলেদেরকে বিশ্বাস করা বোকামী, ওদের মন মুহুর্তেই ঘুরে যায়। প্রেম করলে অসুবিধা নাই, বিয়ে বাবা মার পছন্দে করাই ভালো”

তাই অনেকই সাবধানতা বজায় রেখে (Safety behavior) ভালোবাসতে পছন্দ করেন। যেন সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলেও মনে বেশী কষ্ট না পান। মজার ব্যাপার হল এই সাবধানতাই বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সম্পর্ক ভাঙ্গার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। কারণ এই সাবধানতা অবলম্বনের জন্যই অনেকে সম্পর্কে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখেন, পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি থেকে যায়। সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব নিজের কাছে রাখতে চান কিন্তু নিজেকে পুরোপুরি ইনভলভ করতে চান না। যার ফলে ছোটখাট কিছু ফাঁক ফোঁকর থেকে ধীরে ধীরে দূরত্ব এতো বেশী হয়ে যায় যে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়! তখন তারা আত্মতৃপ্তিতে ভুগেন যে ভাগ্য ভালো তেমন বেশী ভালোবাসেন নি, না হলে তো এখন ভীষণ কষ্ট পেতেন!

ভালোবাসা নিয়ে ভালো ভালো উপদেশ দেয়া বা লাভ গুরু হওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। ভালোবাসতে ভয় পাওয়া –অদ্ভুত এই সমস্যাটিকে আমি অনেক কাছ থেকে দেখেছি, অনেকের মাঝে দেখেছি। সমরেশ মজুমদারের একটা বই পড়েছিলাম ‘অনেকেই একা’। গল্পটা ভালো লাগেনি কিন্তু সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর এই যুগে নামটাকে এখন অনেক যথার্থ মনে হয়। ফ্রেন্ড লিস্টে অনেক অনেক বন্ধু নিয়ে এখন অনেকেই একা! তারা ভালোবাসতে ভয় পান, ভালোবাসা গ্রহণ করতে ভয় পান, কেউ ভালোবাসলে সন্দেহ প্রকাশ করেন, পিছনে রহস্য কি জানতে চান। সাঁতার কাটতে নেমে জলে গা না ভেজানোর মতো ভালোবেসে তার কষ্ট পাওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে চান। কিন্তু নিরাপদ আচরণগুলো সাময়িক স্বস্তি দেয় বটে, কোন সমস্যার সমাধান দেয়না। তাই নিজেকে কষ্ট থেকে বাঁচিয়ে রাখার বা সম্পর্কের কর্তৃত্ব ধরে রাখবার প্রবণতা সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল করে শুধুমাত্র, এর বেশী কোন কাজে আসেনা। এই মন্তব্য আমার পর্যবেক্ষণ থেকে করা। আপনাদের যে কোন মতামত জানানোর আমন্ত্রণ রইল।

শনিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৪

প্যারিস ঘুরে এলাম (শেষ পর্ব)



হোস্টেলে এসে ফ্রেশ হতে হতে বাইরে তখন আঁধার নেমে গেছে। অপরিচিত শহরে সন্ধ্যার পর বাইরে বের না হওয়ারই সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু ঘুমিয়ে পরবার জন্যও তা আবার অনেক তাড়াতাড়ি। স্কাইপে বাসায় কথা বলে নিচে নামলাম। ইচ্ছা ছিল একটু সোশ্যালাইজ হওয়ার। কিন্তু দেখলাম সবাই নিজের ভেতরেই ডুবে আছে। এগমন্ডে যেহেতু আমরা নিজেরাই সবাই ছিলাম। তখন বিষয়টা খেয়াল করিনি। রিশিপশনিস্টকেও দেখলাম খুব ব্যস্ত। প্রায় আমার বয়সী আরেকটি মেয়ে চেক ইন করছে। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম যদি মেয়েটি আমার দিকে তাকায়, যদি একটু কথা বলা যায়। সেরকম কিছু হলনা। মেয়েটি তার জিনিসপত্র বুঝে নিয়ে উপরে উঠে গেল। আমি রিসিপশনিস্টের দিকে এগিয়ে গেলাম।
“আমি দুইদিন প্যারিসে আছি, আইফেল টাওয়ার আর লুভর মিউজিয়াম দেখার ইচ্ছে আছে, কিভাবে যাব, আর কোথায় কোথায় যেতে পারি আপনি কি একটু বলে দিতে পারবেন?” রিসিপশনিস্ট সাথে সাথে ম্যাপ নিয়ে প্যারিসের দর্শনীয় স্থানগুলো দাগ দিয়ে দেখাতে লাগল। কিভাবে যাব তাও বলে দিচ্ছিল কিন্তু মাথায় কিছু ঢুকেছে বলে মনে হয়নি। চার পাঁচটা টুরিস্ট স্পট দেখানোর পর বলল “ এগুলো কালকে দেখে আসেন, আমি কালকে রাতেও এখানে আছি, এরপরে না হয় আবার কথা বলা যাবে”। আমিতো একদিনে এতগুলো জায়গাতে ঘোরা যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছিলাম, রিসিপশনিস্টের কথা তা নির্ভর করছে আমি কতখানি সময় নিয়ে ঘুরতে চাই তার উপর!

সকালবেলা আলসেমিতে বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছিলনা। কিন্তু ব্রেকফাস্টের সময় সকাল দশটা পর্যন্ত। ব্রাজিলিয়ান রুমমেট একসাথে নাস্তার জন্য ডাকল। আমি আসছি বলে তাকে যেতে বললাম। সকালের সবকাজ সেরে একাবারে প্রস্তুত হয়ে নিচে নামতে নামতে আমার রুমমেট নাস্তা সেরে চলে এসেছে। আমি বিব্রতভঙ্গীতে হাসি দিয়ে রুম থেকে বের হলামমাথায় তখনো সারাদিন কিভাবে কাটাব তা নিয়ে চাপ কাজ করছিলো। আগের দিনের অভিজ্ঞতাই আরো বেশি চাপ সৃষ্টি করছিলো, এখানে ডিরেকশন জানতে চাওয়া কঠিন হবে। অথচ আমার প্রতিনিয়তই তা দরকার পড়বে। নাস্তা করতে করতেই দেখি একজন ভদ্রলোক রিসিপশনে ম্যাপ দেখিয়ে কিছু জানতে চাইছেন। ভদলোককে দেখে এশিয়ান মনে হলো। আমি দ্রুত নাস্তা শেষ করে এগিয়ে গেলাম। ততক্ষনে তিনি দরজার বাইরে।  একটু জোরে পা চালিয়ে কাছে পৌছে গেলাম “ হাই, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, আপনি কি এখন কোথাও বেড়াতে যাচ্ছেন?” “হ্যাঁ, লুভর মিউজিয়ামে” তিনি বললেন। “আমি এখানে একা বেড়াতে এসেছি, এখানে তো কেউ তেমন ইংরেজি বলেনা তাই একটু সমস্যা হচ্ছে। আমিও লুভর মিউজিয়াম দেখতে যাব। আমি আপনার সাথে আসি?” অনুরোধটি করার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত আমি জানতামনা আমি এই জাতীয় হাস্যকর অনুরোধ করতে পারি! আমার যে সোশ্যাল এংজাইটি আছে শুধু সে কারণে নয়, অনেকেই বলে আমি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে পছন্দ করি, সেটাও একটা বিশাল কারণ। ভদ্রলোককে একটু দ্বিধান্বিত মনে হলো, তারপরও সঙ্গে নিলেন। জানতে চাইলেন আমি সরাসরি বাংলাদেশ থেকেই এসেছি কিনা। সেই সুযোগেই আমি আমার সাইকোলজিস্ট পরিচয়টা দিয়ে দিলাম, আমস্টারডাম থেকে ট্রেনিং শেষ করে এখানে এসেছি বললাম, তার দামি জিনিসপত্র নিয়ে যে আমি পালাবনা সে বিষয়ে আশ্বস্ত করার জন্য! ভদ্রলোক ইন্ডিয়ান, কর্মসূত্রে জার্মানী এসেছিলেন, সেখান থেকে উইকেন্ডে বেড়াতে প্যারিস এসেছেন। সেদিন বিকেলেই পাঁচটার ট্রেনে আবার জার্মানী চলে যাবেন আমি তখন অনেকটাই রিলাক্সড। বাস স্টপ, বাস, কোথায় নামব তা নিয়ে আর চিন্তা করতে হচ্ছেনা। উনি আগেরদিনও  ঘোরাঘুরি করেছেন, তাই কিছুটা অভিজ্ঞ মনে হলো। উনার পরামর্শ অনুযায়ী বাসের পাস করে নিলাম, যার ফলে যাতায়াত খরচ অনেক কমে গিয়েছিল।

ভদ্রলোককে আইফেল টাওয়ার, মোনালিসা সম্পর্কে বেশ অবসেসড মনে হলো। আগ্রহ আমারও আছে, সেকারণেই প্যারিস আসা, কিন্তু উনার কথা শুনে মনে হলো ঠিক অতটা হয়তো আমার নেই। লুভর মিউজিয়ামে পৌছানোর পর উনার প্রথম কথা হলো “আগে মোনালিসা দেখে নেই”! পুরো লুভর মিউজিয়ামটা দেখার মতো করে দেখতে গেলে মাসখানেক লেগে যাওয়ার কথা। আমরা শুধু মোনালিসার অনুসন্ধান করতে করতে অন্যান্য পেইন্টিং গুলো দেখে গেলাম। আমার কাছে পেইন্টিং হচ্ছে কবিতার মতো, কবিতা যেমন উপন্যাসের মতো পড়ে শেষ করে ফেলা যায়না সেরকম। আমাদের সাথে কোন গাইড নেই, লেখাগুলো সব ফ্রেঞ্চ ভাষায়, তাই পেইন্টিং গুলো শুধু দেখতে কেমন তাই দেখলাম, মর্মার্থ বুঝলাম না! গাঁগাঁর কিছু ত্রিমাত্রিক ছবি লেখলাম। একটা প্লেটের উপর একজন পুরুষের কাটা মাথা রেখে দেয়া! ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যায় কাটা মাথা ধীরে ধীরে চোখ খুলছে। এই জাতীয় ছবি সেই রুমে অনেকগুলো। ঘরের মাঝখানে বিশাল একটি পেইন্টিং-এ একটি মেয়ে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ সময় দিয়ে দেখলে দেখা যায় তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু আমি অবাক হয়ে গেলাম যখন দেখলাম একটি পাখি উড়তে উড়তে ক্যানভাস থেকে বের হয়ে গেল! ছবিটির বিপরীত দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেখানে প্রজেক্টর লাগানো। প্রজেক্টর দেখে বিস্ময়ভাব দূর হয়ে গেল। এই ছবিগুলো এতো বিখ্যাত কেন জানতে ইচ্ছা করল, কিন্তু বলে দেয়ার মতো কেউ ছিলনা। মোনালিসাকে খুঁজে পেতে সময় লাগছিল, আমার সাথের ভদ্রলোক অস্থির হয়ে যাচ্ছিলেন। যেহেতু উনার অনুমতি না নিয়েই উনার সম্পর্কে লিখছি, তাই একটা নাম ধরে নেই, ধরে নেই রাহুল (হিন্দী ছবির নায়কদের সবচেয়ে কমন নাম! ভদলোকের আসল নামও বলিউডের নায়কের নাম, তাই বিষয়টা খুব বেশী সিনেমাটিক হলনা) মোনালিসা খুঁজতে খুঁজতে মজার পরিস্থিতি তৈরি হলো। জিজ্ঞেস করে করে যাওয়া সত্ত্বেও এমন জায়গায় পৌছালাম যে মানুষজন দেখতে পাচ্ছিলাম না। মিউজিয়ামটাও এমন কোন দরজার পেছনে কি অনুমান করা কঠিন। তো রাহুল কাউকে না পেয়ে এক দরজার নব ধরে ধাক্কা দিলেন। সাথে সাথেই দরজা খুলে মিউজিয়াম অথরিটির এক ভদ্রলোক বের হয়ে এলেন। রাহুল তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন “we are looking for Monalisa”. “She is not here” ভদ্রলোক তড়িৎ জবাব দিলেনপেছন থেকে আমি হেসে উঠলাম। ফ্রেঞ্চদের সেন্স অব হিউমারের সাথে প্রথম পরিচয়। তিনি আমাদের দেখিয়ে দিলেন যাদুঘরের কোন অংশে আমরা মোনালিসাকে দেখতে পাব। দেখলাম শুধু আমরাই নই অন্যেরাও মোনালিসা দেখতেই আগ্রহী। যার ফলে যাদুঘরের অন্যান্য অংশে মানুষজন তেমন দেখা না গেলেও মোনালিসা দেখার জন্য ভীড় ঠেলে এগুতে হলো।  মোনালিসা দেখে রাহুল সাহেবের মতো উচ্ছসিত না হলেও কিছুটা অবিশ্বাস্যই মনে হচ্ছিল যে আমি এখন প্যারিসের লুভর মিউজিয়ামে মোনালিসার সামনে দাঁড়িয়ে। পুরো একটি বিশাল দেওয়াল জুড়ে ছোট্ট মোনালিসাটি বসানো। তারপর ফোটসেশন শেষ করে অন্যান্য পেইন্টিংগুলোর দিকে মনযোগ দিলাম। মোনালিসার বিপরীত দিকের পুরো দেয়াল জুড়েই বিশাল এক পেইন্টিং! আয়তনের দিক থেকে বিখ্যাত হওয়া গেলে এটারই সবচেয়ে বিখ্যাত হওয়ার কথা। এতো বিশাল পেইন্টিং লিওনার্দো কিভাবে আঁকলেন তা চিন্তা করেই বিস্ময় জাগে! এরপরে আরো বেশ কিছু পেইন্টিং দেখা হলো, অবশ্যই বিখ্যাত সব চিত্রকর্ম কিন্তু অজ্ঞতার কারণে তার মূল্যায়ন ভালো করে করতে পারলামনা!

লুভর থেকে বের হয়ে আমরা হাঁটতে হাঁটতে নটরডেমের দিকে রওয়ানা দিলাম। সেখানে ৮০০ বছরের পুরানো গীর্জা অপেক্ষা করছে। গীর্জায় পৌছাতে পৌছাতে পথভুল করে করে প্যারিস শহরের অনেকখানি দেখা হয়ে গেল। গীর্জা বাহির থেকে দেখেও আমরা মুগ্ধ! পুরো প্যারিস শহরটাই যাদুঘরের মতো। প্রতিটি বিল্ডিং-এই এতো সুক্ষ্ম কারুকাজ যে মনে বিস্ময় জাগিয়ে তোলে, কিভাবে সম্ভব! কিন্তু গীর্জার বাইরে লম্বা লাইন থাকায় আমরা আর ভেতরে ঢুকলাম না। সেখান থেকে আবার আইফেল টাওয়ারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম, হাঁটতে হাঁটতেই। দূর থেকে টাওয়ারের মাথা দেখে দেখে সেই দিকে হাঁটতে লাগলাম। তখন প্রায় ভর দুপুর। সাথে কিছু শুকনো খাবার ছিলো, তাই খাওয়া হয়েছে। তারপরও কিছুটা ক্লান্ত। কিন্তু বেশ কয়েকবার চেষ্টার পরও বাসের সন্ধান পাওয়া গেলনা। তাই হন্টনই একমাত্র উপায় ছিলোপ্যারিসের সেইন নদীর ধার ধরে হাটতে লাগলাম। কিছুক্ষন পর মজার একটা বিষয় খেয়াল করলাম। নদীর ধারের রেলিং ধরে হাজার হাজার তালা ঝুলছে! প্যারিসে যারা বেড়াতে আসে তারা স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে তালা ঝুলিয়ে রেখে যায়। সেখানে আবার বিভিন্ন রকম মেসেজ লিখা আছে। এভাবেই ন্যাশনাল এসেম্বলি সহ বিভিন্ন যাদুঘর বাইরে থেকে দেখতে দেখতে আইফেল টাওয়ারে পৌছে গেলাম।
ততক্ষনে প্রায় তিনটা বাজে। একটা বেঞ্চে বসলাম পা দুটোকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য। এর মাঝেই রাহুল সাহেবের মনে পড়ল তার ব্যাগে ওয়াইন আছে। গতকাল কিনেছিলেন, শেষ করতে পারেন নি, অর্ধেক অবশিষ্ট আছে। বের করে এক চুমক খেয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন “আপনি খাবেন?” দেশে যদি কখনো এরকম পরিস্থিতি হতো, আমাকে কেউ মদ খাওয়ার অফার করত, আমি নিশ্চয়ই ফিট হয়ে পড়ে যেতাম। আমার ধর্মীয় মুল্যবোধ বেশ শক্তিশালী, তাই কৌতুহল কম। মনে হতো এর চেয়ে বদমাশ লোক আর পৃথিবিতে নেই! কিন্তু তখন সেরকম কিছু মনে হলনা। কারণ এর আগে আমাদের ট্রেনিং-এ ডিনারে ব্রেডের মতো ওয়াইনও রেগুলার আইটেম ছিলো। সাইকোলজিস্টের সংখ্যায় যেহেতু মেয়েরা বেশী, তাই মেয়েদের অনুরোধই বেশী প্রত্যাখ্যান করতে হয়েছে। তাই এখানেও সংক্ষেপে বললাম “না”। তখন তিনি বললেন “আরে নেন, না হলে আমি কিন্তু পুরোটা খেয়ে ফেলব”। আমি হেসে ফেললাম, বললাম “নির্দিধায়”।

ততক্ষনে উনার যাবার সময় হয়ে গেছে। আমাকে বারবার করে বললেন আমি যেন ভালো করে সময় নিয়ে আইফেল টাওয়ার দেখি। সন্ধ্যার পরে যে টাওয়ারটি দেখতে পুরাই অন্যরকম লাগে তাও বললেন, কোথায় বসে দেখব, কিভাবে হোস্টেলে ফিরব তাও দেখিয়ে দিলেন! তারপর বিদায়বেলা হাত বাড়িয়ে দিলেন হ্যান্ডশেক করার জন্য। আমি বললাম “আপনি কি খুব বেশী বিব্রতবোধ করবেন আমি যদি হ্যান্ডশেক না করি? আমার অভ্যাস নাই তো” তিনি বেশ সহজভাবেই বাড়ানো হাত টেনে নিলেন, বললেন “ না না ঠিক আছে, কমফোর্টেবল না হলে দরকার নেই”। তারপর চলে গেলেন।

যেখান থেকে আইফেল টাওয়ার সবচেয়ে ভালো দেখা যায় আমি সেখানে গিয়ে একটি বেঞ্চে বসলাম। পাশে ১৪ বা ১৫ বছরের গোলাপী একটি মেয়ে বসে আছে। তার হাতে একটি কাগজ যেখানে চার কোনায় চারটি লাভ চিহ্ন আঁকা। মেয়েটি গোলাপী রঙের নেইলপলিশ দিয়ে রঙ করছিল। তারপর মোবাইল দিয়ে তার ছবি তুলছিল। আমি আইফেল টাওয়ার দেখা বাদ দিয়ে তার কর্মকান্ড দেখতে লাগলাম। সে একই প্রক্রিয়ার আবার পুনরাবৃত্তি ঘটাল। ছবিটা ভালো করে তোলার চেষ্টা করছিল। আমার কৌতুহলী চোখ দেখে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। আমি হাসি ফিরিয়ে দিলাম। তারপর টুকটাক কথা বলা শুরু হলো। মেয়েটি ইয়েস নো ছাড়া আর কোন ইংলিশ জানেনা আর আমি ফ্রেঞ্চ সেটুকুও জানিনা। তারপরও দুজনের ভেতর ভাব হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আমরা দুজন মিলে বেড়াতে গেলাম। আইফেল টাওয়ার, তার সামনের মেলা, নদীর ধারের বেড়নোর অংশটুকু ঘুরে বেড়ালাম। মেয়েটির সাথে প্রায় তিন ঘন্টা ছিলাম। এর মাঝে সেও অনেক কিছু বলেছে আমি বুঝতে পারিনি, আবার আমিও চেষ্টা করেছিলাম মনে হয়নি সে বুঝেছে। ইশারা ইঙ্গিতটুকুই ছিল ভরসা। তারপর সন্ধ্যায় আইফেল টাওয়ারের বাতিগুলো জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে হোস্টেলে ফেরার উদ্যোগ নিলাম। সেই মেয়েটি আমাকে পথ দেখিয়ে মেট্রোতে নিয়ে গেল। এখান থেকেই তার পথ আর আমার পথ ভিন্ন। এতো মিষ্টি একটা মেয়ে, বিদায় নেয়ার সময় কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে রইলাম, আর দেখা হবেনা।  যে নম্বরের ট্রেনে উঠার কথা তাতে উঠে পড়লাম, তারপরও আবার নিশ্চিত হবার জন্য একজনকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন যে এই ট্রেনই যাবে কিন্তু আমাকে বিপরীত রুট থেকে উঠতে হবে। তারমানে তখন আমি গন্তব্যস্থল থেকে আরো দূরে সরে যাচ্ছি! তাড়াতাড়ি পরের স্টপেজেই নেমে পড়লাম। মেট্রোর গোলকধাঁধায় পথ হারানো অস্বাভাবিক
নয়। অপরদিক থেকে আবার ট্রেনে উঠে গন্তব্যস্থলে পৌছালাম। তারপর সেখান থেকে প্যারিস শহরের প্রায় অর্ধেক মানুষকে জিজ্ঞেস করতে করতে হোস্টেলে পৌছালাম!

আমি এরপরের দিনও প্যারিসেই কাটিয়েছি। সেদিন সারাদিন একাই ঘুরে বেড়িয়েছি। সেদিনও অনেক নতুন অভিজ্ঞতা ছিল কিন্তু অলসতার কারণে আর লিখতে ইচ্ছে করছেনা। লেখাটা শুরু করেছিলাম নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কারের কথা দিয়ে। আমাকে দিয়ে যে কিছু হবে না তা আমি আগের মতো আর বিশ্বাস করিনা। আমার রিসার্চের কাজ নিয়ে কিছুটা স্টাক হয়ে আছি, ঘুরেফিরেই মাথায় চলে আসে আমাকে দিয়ে হবেনা। কিন্তু এখন আগের থেকে অনেক বেশী বিশ্বাস করতে পারি যে আমি পারব!

এখান থেকে আমার বন্ধুদের শুধু এটুকুই বলতে চাই যারা পারবনা মনে করে কোন লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যান, তারা ফিরে আসার পথ ভুলে গিয়ে কাজটিতেই ঝাঁপিয়ে পড়ুন। দেখবেন নিজের সম্পর্কে এমন অনেক নতুন ধারণা পাবেন যা আপনি নিজেই জানতেন না।