শনিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৪

প্যারিস ঘুরে এলাম-১



শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাববেন এই লেখা এখানে কেন, ভ্রমণ বিষয়ক লেখা মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পাতায়! কিন্তু প্যারিস কত চমৎকার তা এই লেখার মূল বিষয়বস্তু নয়, প্যারিস ভ্রমণের সময় নিজেকে যে নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম তা এই লেখার মূল উপজীব্য। সেই বিবেচনায় লেখাটা এখানে জায়গা পেতেই পারে।

যেহেতু বলেছি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরবো, তাই পুরানো আমি সম্পর্কেও কিছু বলা দরকার। আমরা প্রত্যেকেই পরিবার ও পরিবেশ থেকে নিজেদের সম্পর্কে ধারণা লাভ করি। আমিও নিজের সম্পর্কে তেমন কিছু ধারণা নিয়েই বড় হয়েছি, যেমন অলস, অগোছালো, অপদার্থ ইত্যাদি। আমাকে দিয়ে যে কিছু হবেনা এই কথা আমি এতো শুনেছি যে বেশ সিরিয়াসলি বিশ্বাস করি। ছোটবেলা থেকে যে বিষয়টা ভালো পারতাম তা হলো বই পড়া। এখানেও কিন্তু আছে, পড়ার বই না গল্পের বই। কিন্তু আমি যেহেতু এতো অলস প্রকৃতির পড়াশোনা করলেও যে আমাকে দিয়ে কিছু হবেনা এ বিষয়ে সবাই একমত ছিলো। একথা সত্যি ঘরের কাজের ক্ষেত্রে আমি অনেকটাই অলস। এখনো রান্না করার চেয়ে না খেয়ে থাকাটা সহজ মনে হয়! তবে আমার এই অলস হয়ে তৈরি হওয়ার পেছনে আমার পরিবারের ভূমিকা নেহাত কম নয়। আমার বাবা আমার কাজগুলো করে দিতে খুব পছন্দ করে, আমার পড়াশোনাটাও আব্বু করে দিত, শুধু সম্ভব নয় বলে আমি করতে শিখেছি। যার ফলে বইয়ের জগতের বাইরে কোন কিছু সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা জন্মায়নি। আমি স্বভাবে অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ এবং নড়বড়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে বড় হয়েছি।

মাস্টার্সে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে ঢোকার পর নিজেকে রিফর্ম করার উদ্যোগ নিলাম। আমার সুপারভাইজর বললেন ক্লায়েন্টকে যে হোমওয়ার্ক দিব তা যেন নিজে আগে অনুশীলন করে নেই। নিজেকে বোঝা ও পরিবর্তনের ক্রমাগত প্রচেষ্টাই আমাকে পেশাগত দিকে সফলতা লাভের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে দিলো। যার ফলশ্রুতিতে পরিবারের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠার জন্য দেশের প্রায় শেষ প্রান্তে একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরিতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। উপরোক্ত সমালোচনার পাশাপাশি পরিবারের সমর্থনের কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। চাকুরিতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আমাকে যুদ্ধ করতে হয়নি। আমাদের পরিবারের মানুষগুলো যখন আমাদের সমালোচনা করে তারমানে এইনা যে তারা আমাদের ভালোবাসে না, তারা শুধু বুঝতে পারেনা নেতিবাচক এই কথাগুলো মানুষের আত্মবিশ্বাসকে কতখানি গুড়িয়ে দেয়!

মেন্টাল হেলথ কোর্স ট্রেনিং-এর জন্য যখন আবেদন করেছিলাম, অনেকখানিই আত্মবিশ্বাস ছিলো যে সিলেক্টেড হবো। কিন্তু নিজেকে গুছিয়ে রাখতে পারব, কোন ভুলভাল ছাড়াই ঠিকমতো পৌছাতে পারব এই বিষয়ে অতটা আত্মবিশ্বাস ছিলনা। কারণ ট্রেনিং হবে নেদারল্যান্ডের এগমন্ডে। শুধু মনে হতে লাগল আমি নিশ্চয়ই পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলব, বা জরুরী কিছু হারিয়ে ফেলব বা ফেলে যাব। যাওয়ার আগের রাতে ঘুমাতে পারলাম না।

আমস্টার্ডামের শিফল এয়ারপোর্ট থেকে হোস্টেল পৌঁছানোই প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিলো। লাগেজ কালেক্ট করার সময় মনে হতে লাগল আমি বোধহয় আমার লাগেজ চিনতে পারবনা। এই চিন্তা আসা মাত্রই হার্টবিট বেড়ে গেল! প্রায় অনেক্ষণ পরেই লাগেজ উদ্ধার করতে পারলাম। প্লেনে আমার পিছনের সিটে থাকা এক বয়স্ক দম্পতি আমাকে ম্যাপ বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেন, টিকেট কাটতে সহায়তা করলেন এবং প্লাটফর্মও দেখিয়ে দিলেন যেখান থেকে ট্রেনে উঠতে হবে, মাঝে আবার ট্রেন চেঞ্জ করতে হবে তারপর আবার বাস। এতো বেশি স্ট্রেস কাজ করছিল যে ভাল করে কিছু চিন্তাও করতে পারছিলাম না। ট্রেন আসলো, আবার আরেক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম এটাই সেই ট্রেন কিনা কনফার্ম হওয়ার জন্য। ভদ্রলোককে এশিয়ান মনে হলো, কিন্তু তা জানার সুযোগ ছিলনা। লাগেজ টেনেহিচঁড়ে উঠলাম, তিনিও উঠলেন। আমি উঠেই কোন স্টেশনে আবার নামব তা বলার জন্য মুখ খুলতেই ট্রেন ছেড়ে দিলো, আর সাথে সাথেই আমি ম্যাট্রিক্স ছবির মতো পেছনে দিকে পড়ে যেতে লাগলাম। ভদ্রলোক আমাকে হাত বাড়িয়ে ধরে ফেললেন। ট্রেনে এতোগুলো মানুষের সামনে আমি পড়ে যাচ্ছি আর অপরিচিত এক ভদ্রলোক হাত ধরে আমার পতন রোধ করেলেন, যে কোন স্বাভাবিক সময়ে এই লজ্জাতেই আমি মরে যেতে চাইতাম। কিন্তু ওই মুহুর্তে আমি দ্বিতীয়বার ভাববার অবকাশ পেলাম না। সোজা হয়ে দাঁড়িয়েই ম্যাপ দেখিয়ে জানতে চাইলাম “আমি এখানে নামব, কখন নামতে হবে আপনি কি একটু বলে দিতে পারবেন?”

আমি ঠিকমতোই হোস্টেলে পৌঁছেছিলাম, তবে সেখানে অনেক মানুষের অবদান আছে। সেই ডাচ ভদ্রমহিলার কথা না বললেই নয়, যিনি আমার লাগেজ নিয়ে প্রায় দৌড়ে আমাকে বাসে তুলে দিয়েছিলেন। কারণ সেখানে একঘন্টা পরপর বাস ছাড়ে, না হলে আমাকে একঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। এগারোদিনের ট্রেনিং-এর পর যখন প্যারিসে বেড়াতে যাওয়ার সময় আসল সেই রাতেও ঘুমাতে পারিনি। এক অজানা ভয়ে মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল। কারণ এর পরে পুরোটাই একা। এই কদিন বিভিন্ন দেশের হলেও একই প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের সাথে ছিলাম। অনেকের সাথেই ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। যেকোন সমস্যাই, সমস্যা বলে মনে হয়নি। আমার ভেতরে কিছু শিশুসুলভ আচরণ আছে, যার কারণে যেখানেই থাকিনা কেন কেউ একজন গার্জিয়ানে ভূমিকা নিয়ে নেয়। ট্রেনিং-এও একজন ইন্ডিয়ান আপু ছিলেন! কিন্তু পরবর্তি পাঁচ দিন আমি নিজেই সম্বল। মনে হতে লাগল আমি সকালে নিশ্চয়ই বাস মিস করব, হয়তো কিছু ভুলে ফেলে যাব, ফ্রেঞ্চরা নাকি ডাচদের মতো বন্ধুসুলভ না, তারা ইংলিশ বলতে চায়না, কোন কিছু জানতে চাইলে উত্তর দেয়না, ভাবতে ভাবতে মাথা হ্যাং হয়ে যাচ্ছিল। কি হবে আমার, আর প্যারিসের পকেটমারদের এতো এতো সুনাম শুনেছি যে কিছু না হারিয়ে ঠিকঠাক মতো ফিরতে পারব তা অসম্ভব মনে হচ্ছিল।
সকালবেলা ঠিকমতোই বাস কাউন্টারে এসে পৌছালাম। আমার দুইহাতে দুইটি শপিংব্যাগ, যার একটি যে কোন মুহুর্তে ছিড়ে জিনিসপত্র সব ছড়িয়ে পড়তে পারে। শপিংব্যাগের রহস্য হলো মূল লাগেজ অফিসে রেখে এসেছি, পরামর্শ ছিলো এতো বড় লাগেজ যেন প্যারিসে না নিয়ে যাই, শুধু যা লাগবে সেটুকুই নেই। দেখা গেল শুধু স্যুটকেসটাই অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছি, জিনিসপত্র বেশিরভাগই বাইরে। যার ফলশ্রুতিতে দুই হাতে দুই পলিথিনের ব্যাগ, যার একটা ছিড়ে যায় যায় অবস্থা! খুব স্বতস্ফূর্ত ভাবেই মাথায় চলে এলো যে আমাকে দিয়ে কিছু হবেনা। কিন্তু সেই পরিস্থিতিও সামলে নিতে পেরেছিলাম।
রাতের ঘুম বাসে ঘুমালাম। পাশের সিট ছিল খালি তাই কোন কিছু নিয়ে ভাবতে হল না। সাত ঘন্টা জার্নির পর প্যারিস গ্যালিনিতে এসে পৌছালাম। ভাবলাম এখান থেকেই হোস্টেলে সরাসরি চলে যাওয়া যাবে। কিন্তু একজন দেখিয়ে দিলেন আমি যেখানে আছি তা প্যারিসের শেষ প্রান্ত। শহরে যেতে আরো কিছু সময় লাগবে। মেট্রোতে দুইবার ট্রেন চেঞ্জ আর আরো একবার বাস আর কি! এখন মেট্রোতে কোথা থেকে উঠব বুঝতে পারছিনা, মানুষজনও নাই জানতে চাওয়ার মতো। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে বললেন জানেন না। বেশী অবাক হইনি, ফ্রেঞ্চরা অমিশুক হয় সে বিষয়ে অনেকেই বলে দিয়েছিল। পরে এক ইন্ডিয়ান ভদ্রলোক ট্রেনের টিকিট কেটে কোন ট্রেনে উঠবো দেখিয়ে দিলেন। মেট্রোতে বসে যখন কানে বাংলা কথা ভেসে আসল ভাবলাম হ্যালুসিনেশন হচ্ছে কিনা! ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখি একজন মোবাইলে বাংলায় কথা বলছে, বাংলাদেশী বাংলায়। দুই চারটা বাক্য বিনিময়ের পরের স্টপেজেই তিনি নেমে গেলেন। আমিও নেমে যখন পরের ট্রেনে উঠে যার কাছে জানতে চাইলাম ট্রেনটি মপারনেস যাচ্ছে কিনা, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন “আপা আপনি কি বাংলাদেশী?”। ২০ বা ২২ বছরের একটি ছেলে। সে বলল “ আপা চিন্তা কইরেন না, আমিও ওইখানেই নামমু”। তাকে জিজ্ঞেস করলাম কি করে, এখানে পড়াশুনা করে কিনা। সে বলল এখানে চাচাদের কাছে আসছে, কিছু করেনা, খায়দায় আর ঘুরে। প্যারিসে কেউ খাচ্ছেদাচ্ছে আর ঘুরছে জেনে ভালই লাগল। ট্রেন থেকে নেমে স্টেশন থেকে বের হওয়ার পথে ছেলেটি তার চাচতো ভাইয়ের কাছে নিয়ে গেলো। বললো “ এই আপা বাংলাদেশ থেকে আসছে, ৯৫ নাম্বার বাসে যাইবো। কোনখান থেকে উঠবো জানো?”। তার ভাই সেখানে ফুল বিক্রেতা। বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনেই এগিয়ে এসে হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে নিলেন। আমিও বেশী বাঁধা দিলাম না কারণ কাঁধ ব্যাথা করছিলো। বাংলাদেশ থেকে কবে এসেছি, কদিন থাকব, দুপুরে কিছু খেয়েছি কিনা, কোথায় থাকব এরকম প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে এগিয়ে চললাম। আমি একা এসেছি শুনে বললেন “কেমন হইল আপা, একা একা আসলেন, দুলাভাইরে নিয়া আসলে কত ভালো হইতো!” আমিও পুরোপুরি একমত। দুলাভাইকে নিয়ে আসতে পারলে অবশ্যই অনেক ভালো হতো, কিন্তু শুধুমাত্র প্যারিস ট্রিপের জন্য এতো শর্ট নোটিসে দুলাভাই জোগাড় করা যায়নি, কি আর করা! তারপর উনি আমাকে বাস কাউন্টারে রেখে, কিছু না খাওয়াতে পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিদায় নিলেন। কিছুক্ষণ পর বাস আসার পর আমি উঠে এই ঠিকানায় যাব বলতেই ড্রাইভার গম্ভীর গলায় বললেন যে আমাকে রাস্তার ওপারের কাউন্টার থেকে উঠতে হবে। ফলে নেমে রাস্তা পার হয়ে আবার দাঁড়ালাম। কিছুক্ষন আবার বাস আসল, আমি ড্রাইভারকে বললাম আমি এই ঠিকানায় যাব, বাসটা সেখানেই যাবে কিনা। ড্রাইভার বলল “I don’t speak English, I don’t speak English”. বলে বাস ছেড়ে দিল। সে ইংলিশ বলেনা তা বুঝতে পারলেও বাসটা সেখানে যাবে কি যাবে না তা বুঝতে পারলাম না। এদিকে আবার বাস চলতে শুরু করেছে। আশেপাশের মুখগুলি দেখে সাহস পেলাম না। কেউ ইংলিশে কথা বলেনা। পরে আমার বয়সী একটি মেয়ে আমাকে বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল, অতিকষ্টে তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংলিশ পুনরুদ্ধার করতে পারলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম আমি যে যাচ্ছি আমার কি টিকেট লাগবেনা। পরে সে ড্রাইভারের সাথে কথা বলে টিকেট কেটে দিল। বাস ড্রাইভারের আচরণে একটু আহত হয়েছিলাম। ফ্রেঞ্চরা যে rude তা আবারো মনে পড়ল। তারপর নির্দিষ্ট স্টপেজে নেমে গেলাম। সাথে একজন বয়স্ক মহিলাও নামলেন। ড্রাইভারকে মনে হলো তাকে কিছু বলে দিলেন। আমি হোস্টেলে ঠিকানাটা দেখিয়ে কোথায় হতে পারে জানতে চাইলাম। ভদ্রমহিলা ইংলিশ বলেন না আর আমি একবর্ণও ফ্রেঞ্চ বুঝিনা। সৌভাগ্যক্রমে বিল্ডিং-এর নাম্বারগুলো ইংরেজিতেই ছিল। তিনি আমাকে দেখিয়ে দিতে লাগলেন। আমার সাথে সাথে এসে হোস্টেল পর্যন্ত খুঁজে বের দিলেন। উনাকে জড়িয়ে ধরে বিদায় দিলাম, তিনিও কিছু বললেন, বুঝতে পারিনি, কিন্তু ভালো কিছু যে সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। ভালোবাসার প্রকাশ সার্বজনীন, ভাষার প্রতিবন্ধকতা খুব বেশী প্রভাব ফেলতে পারেনা। তাই ফ্রেঞ্চরা যে অমিশুক হয় সেই ধারণাটা একটু পরিবর্তন করে নিলাম, হয়তো অধিকাংশ ফ্রেঞ্চরাই অমিশুক হয়, কিন্তু সবাই নয়।

হোস্টেলের রিসিপশনে ফ্রেঞ্চ মুভি থেকে উঠে আসা নায়কের মতো রিসিপশনিস্ট ছিলো। তার কাছ থেকে কার্ড ও অন্যান্য কিছু বুঝে নিয়ে নিজের রুমে চলে গেলাম। চার বেডের ফিমেল ডর্ম। রুমে তখন আর কেউ ছিল না। ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে রেখে, বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় আরাম করে বসার পর প্রথমবার মনে হলো, “My goodness!!! আমি এখন প্যারিসে, সত্যি সত্যি!!!

রবিবার, ৫ জানুয়ারি, ২০১৪

An Additional Language- Dolls (ভাষাকে শক্তিশালী করার হাতিয়ার হিসাবে পুতুল)



ছয় মাসের বেশী সময় ধরে ব্লগে লেখালেখি করিনা, ব্লগে কিভাবে ঢুকতে হয় তাও ভুলে গিয়েছিলাম! অথচ যখন শুরু করেছিলাম ইচ্ছা ছিল প্রতিদিনই কিছু না কিছু লিখব। আমার এইরকমই হয়, মাঝে মাঝেই হারিয়ে যাই, লক্ষ্য থেকে সরে যাই। কিন্তু ভালো দিকটা হলো যখন হারিয়ে যাই তখনও বিশ্বাস করি যে আবার ফিরব। তাই অনেকদিন পর হলেও আবার বন্ধুদের মাঝে ফিরলাম নতুন অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়ার জন্য। কিছুদিন আগে দেশের বাইরে গিয়েছিলাম মেন্টাল হেলথ কোর্স ট্রেনিং-এ। সেখানে নতুন নতুন অনেক কিছু শিখেছি সেরকম না হলেও অনেক কিছু নতুনভাবে শিখেছি। তবে কাউন্সেলিং-এর নতুন একটা উপকরণ (tool) এর ব্যবহার খুবই আকর্ষনীয় লেগেছে যা নিয়ে আজকে লিখব।

An Additional Language- Dolls – বিষয়টা যখন ট্রেনিং ম্যাটেরিয়ালে দেখেছিলাম, বিষয়বস্তু কি হতে পারে তা অনুমান করতে পারিনি। সকালে ট্রেইনারকে দেখে একজন মন্তব্যও করে ফেললো যে ট্রেনিং বোরিং হবে! কিন্তু আমাদের যা মনে হয় তা সবসময় যে সত্যি হয়না তা প্রমাণ করার জন্যই ট্রেইনার চমৎকার একটা এক্সারসাইজ করিয়ে আমাদের মনযোগ টেনে নিলেন। তারপর ঘোষনা করলেন যে উনি একটি ফ্রি কাউন্সেলিং সেশন দিবেন তারজন্য ভলান্টিয়ার লাগবে তবে বিরতির পর। ফ্রি পেলে নাকি মানুষ আলকাতরাও নেয়, আমারও বিনা পয়সায় কাউন্সেলিং করানোর ইচ্ছা হয়েছিলো কিন্তু দেখলাম চা কফি খাওয়ার সময়ই ভলান্টিয়ার ঠিক হয়ে গেছে। তাতে অবশ্য ফ্রি সেশন পর্যবেক্ষণ করার আনন্দ কম হলনা। 

ক্লায়েন্ট রোল-এ যিনি ছিলেন তিনি একটি এইচ আই ভি প্রজেক্টের টিম লিডার ছিলেন। কাজের অতিরিক্ত চাপ তার জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। যখন তিনি অল্প অল্প করে সমস্যাগুলো প্রকাশ করছিলেন তখন যিনি মনোবিজ্ঞানী ছিলেন তিনি তার বাক্স থেকে ক্লায়েন্টের বর্ণনা অনুযায়ী চরিত্রগুলোকে তুলে নিয়ে টেবিলের উপর পুতুল দিয়ে সাজাচ্ছিলেন। প্রথমে অবশ্য তিনি ক্লায়েন্টের অনুমতি নিয়ে নেন। ক্লায়েন্টের নিজেকে রিপ্রেজেন্ট করার জন্যও দুইটি পুতুল ছিল, একটি একটু বড় (adult doll) যা ক্লায়েন্টের যৌক্তিক চিন্তার অবস্থাকে নির্দেশ করে, আরেকটি একটু ছোট সাইজের পুতুল (inner child doll)যা ক্লায়েন্টের মানসিক অবস্থাকে নির্দেশ করে। ক্লায়েন্টের বর্ণনা থেকে যতগুলো চরিত্র উঠে আসে তার প্রতিটির জন্যই দুটি করে পুতুল। ক্লায়েন্ট নিজেও পুতুলগুলোকে বাছাই করে নিতে পারে, চরিত্র অনুযায়ী মানানসই করে। এখানে সাইকোড্রামার কিছুটা আভাস পাওয়া যায়, যেখানে মানুষের দুইটি স্বত্বা ফুটে উঠে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে গল্পটি চলতে থাকে। এছাড়াও আরো কিছু কিছু এক্সেসরিজ ব্যবহার করা হয় পরিস্থিতিকে সহজভাবে উপস্থাপন করার জন্য। যার ফলে দেখা যায় ক্লায়েন্ট যা বলছে তার হুবুহু রেপ্লিকেশন আমরা টেবিলের উপর নাটকের আকারে দেখতে পাচ্ছিলাম! ক্লায়েন্ট নিজেও নিজেকে, নিজের অনুভূতিগুলোকে, তার পরিবেশকে, পরিবেশের চরিত্রগুলোকে, তাদের অনুভূতিগলোকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলো। যা কিনা ক্লায়েন্টকে নিজের সমস্যা এবং তার প্রকৃত কারণগুলোকে আরো ভালোভাবে বুঝতে  সহায়তা করছিলো। অর্থাৎ কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপীর মাধ্যমে আমরা ক্লায়েন্টের যে সমস্যা এবং তার সমাধান সম্পর্কে যে অন্তর্দৃষ্টি (insight) সৃষ্টি করতে সহায়তা করি তা এই additional language- dolls এর ব্যবহারে অনেক সহজ হয়ে যায়।

সাইকোলজিস্ট যেহেতু একটি মাত্র সেশন-ই করে দেখানোর সুযোগ পেয়েছিলেন তাই পরবর্তি সেশনগুলোতে কিভাবে অগ্রসর হওয়া যায় সেই প্রসঙ্গে কথা বললেন এবং আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিলেন। তিনি তার প্রাকটিসে এখন এই মাধ্যমটি ব্যবহার করেন এবং তিনি মূলত রিফুইজি ও মাইগ্রান্টদের নিয়ে কাজ করেন। এই বিষয়ক মাত্র একটি আর্টিকেল এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে ম্যানুয়েল লেখার ইচ্ছা আছে কিনা জানতে চাইলে এ বিষয়ক আরো গবেষণার প্রয়োজনীতার কথা বলেন।

এই ছিলো আমার ট্রেনিং সেশনের অভিজ্ঞতা। কিন্তু বিষয়টির নতুনত্বের কারণে আমি আর্টিকেলটিও পড়ে ফেললাম। লেখকেরা মূলত আর্মড কনফ্লিক্ট এড়িয়াতে রিফুউজিদের নিয়ে এই মাধ্যমে কাজ করেছেন। কাউন্সেলিং ও ট্রেনিং করিয়েছেন। এর সুবিধা হিসাবে তারা বলেছেন যে এর মাধ্যমে ক্লায়েন্ট তার সমস্যাকে অনেক সহজেই ভিজুয়ালাইজ করতে পারে। ক্লায়েন্টের বর্ণনাকে সহজেই প্রতীকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা যায়। যেমনঃ যৌতুকের সমস্যাকে কয়েনের দ্বারা, মদ্যপানের সমস্যাকে ছোট বোতলের মাধ্যমে, রাগী একজন মানুষকে হাত উঠানো পুতুলের দিয়ে আবার ক্লায়েন্টের সমস্যা সমাধানের ব্যাক্তিগত ইতিবাচক দিকগুলোকে গুপ্তধনের বাক্স দ্বারা!

এছাড়াও এর মাধ্যমে ক্লায়েন্ট তার নিজের এডাল্ট ডল অর্থাৎ তার যৌক্তিক মানসিক অবস্থা ও তার আবেগীয় (inner child doll) অবস্থার সাথে সমস্যাটি নিয়ে কথোপকথন চালাতে পারে, যা কিনা তার বাস্তবতা ও আবেগীয় অবস্থার মধ্যে যে দূরত্ব তা বুঝতে সহায়তা করে। আবার সমস্যা সমাধানে তার উপস্থাপিত অন্যান্য চরিত্রগুলো কিভাবে সহায়তা করতে পারে বা তারা কিভাবে দেখতে পারে সেই বিষয় উঠে আসে, যা কিনা অনেকটা সমস্যা সমাধানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
পরিশেষে লেখকেরা এই টুলটি ব্যবহারে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন প্রথমদিকে কাজ করতে গেলে হয়তো হাস্যকর মনে হতে পারে কিন্তু অনুশীলন ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এটি একটি শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হতে পারে। সেশন শেষে অনুশীলনে আমি নিজেও অংশগ্রহণ করেছিলাম তাই আমিও লেখকদের সাথে একমত পোষণ করি।




শনিবার, ৮ জুন, ২০১৩

সাভার ট্রাজেডি এবং কিছু অভিজ্ঞতা!

উখিয়াতে যাওয়ার পর টিভি দেখা ও পেপার পড়া প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মনে হতো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। কিন্তু তারপরেও ঘটনার রাতেই খবর পেলাম সাভারে বিল্ডিং ধসের কথা। পাশের ঘর থেকে সেন্সেশনাল এই নিউজ দেখার জন্য ডাকাডাকি শুরু হলো। আমি কয়েকটা দৃশ্য দেখে নিজের রুমে ফিরে এলাম। এবং মাথা থেকে বের করে দেয়ার চেষ্টা করলাম। এটা খুবই স্বাভাবিক মাঝেমধ্যেই সাভারেসের  দু একটা বিল্ডিং ধসের ঘটনা ঘটবে, মানুষ মারা যাবে, অনেক আলোচনা হবে, পত্রিকায় লেখালেখি হবে, তারপর আবারো আরেকটি ঘটনা ঘটবে! ব্যাক্তিগতভাবে এতো আবেগপ্রবণ হওয়ার কিছু নাই। যুক্তি মস্তিস্ক বুঝলেও মন বোঝেনা। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া শুরু হলো। আমার সমস্যা এইটাই, করার কিছুই থাকে না কিন্তু নিঃশ্বাস নেওয়ার কষ্ট সহ বিভিন্ন লক্ষণ শুরু হয়। কিন্তু এইবার ঘটনার পরদিন ছুটির দিনে অফিস থেকে ফোন পেলাম যে সাভারের দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আমার জন্য কি এই ছুটির সময়ে যাওয়া সম্ভব কিনা। কি বলে? আমি প্রতিটি মুহূর্তে কত কত বার ভাবছি, ইশ যদি আমি ঢাকায় থাকতাম! হয়তো ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণ করতে পারতাম! পরদিনই অফিসের পক্ষ থেকে ঢাকায় চলে আসলাম সাভার ভিক্টিমদের প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার জন্য। লোকবল বাড়ানোর জন্য প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সেবার (Psychological First Aid, PFA) প্রশিক্ষণ দিয়ে নিলাম। তারপর ১২ জনের একটি দল নিয়ে এনাম মেডিক্যাল কলেজে পৌছে গেলাম। কলেজটির পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগীতা পেয়েছি। কিন্তু যে বিষয়টি কাজের অসুবিধা করেছে তা হলো হাসপাতালটিতে সকলের অবাধ আনাগোনা। কেউ কয়েকটা বিস্কুট, লুঙ্গি-শাড়ী নিয়ে, কেউ ডোনেশন নিয়ে, কেউ বা শুধু এলাকার বা নিজের অঞ্চলের লোকদের জন্য ডোনেশন নিয়ে! কেউ কেউ ভিজিট করার জন্য, আবার একটি স্কুল থেকে আসা বাচ্চাদেরও দেখা গেল!!! দেখা গেল আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার জন্য লাইনে দাড়াতে হচ্ছে! আমার এক্সপাট বস পরিস্থিতি দেখে খুবই বিরক্ত। তাই দুইদিনে কাজ শেষ করেই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু আমার অর্গানাইজেশনের যেহেতু দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছিল তাই আমি রয়ে গেলাম।

দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে যাদের অফিসিয়াল ডকুমেন্ট পাওয়া গিয়েছিল সেই প্রতিটি নাম্বারে ফোন করে তাদের মানসিক অবস্থার খোঁজ খবর নেয়া হয়েছিলো যেন এই প্রাথমিক মিডিয়ার ধাক্কা কাটার পর তাদের যখন আসলেই তাদের সাহায্যের প্রয়োজন পড়বে তার একটা পরিকল্পনা করা যায়। আমি নিজেই উপযাচক হয়ে প্রায় একশোর মতো ফোন করেছি যেন দুর্ঘটনা পরবর্তী মান্নসিক সমস্যা কি ধরনের হতে পারে তা ভালো করে উপস্থাপন করতে পারি। তারপর পরিকল্পনাকালীন সময়ে আবার নিজ কাজের ক্ষেত্র উখিয়াতে ফিরে গেলাম।

সপ্তাহখানেক পরই আবার ঢাকায় দ্বিতীয় দফা কাজ শুরু করার জন্য। সাথে কানাডিয়ান মেন্টাল হেলথ অফিসার। তিনি শুধু যেন একক ভাবেই না গ্রুপেও ভিকটিমদের সাপোর্ট দিতে পারি সে বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিলেন। এর পাশাপাশি ঢাকা ইউনিভার্সিটির সাইকোলজির ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির স্টুডেন্টদের ধন্যবাদ পাওনা যারা এই ধাপে আমাকে সহায়তা করেছে। তাদের অদম্য ইচ্ছাই পরীক্ষা মাথায় নিয়েও তারা এই মহৎ একটি কাজে সম্পৃক্ত হতে উদবুদ্ধ করেছে!

দ্বিতীয় আমার কাজ ছিলো মূলতঃ কাজটিকে শুরু করিয়ে দেয়া। প্রথম গ্রুপ করে আশানূরুপ ফলাফল পাওয়ার পর আবার আমার নিজ কাজের জায়গায় ফিরে যাওয়ার সময় হলো। কাজ চলছে, প্রয়োজন সাপেক্ষে চলতে থাকবে।

এই কাজ চলাকালীন সময়েও অনেক সময় মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়েছে, বুক ভার হয়ে গিয়েছে কিন্তু ভালো লাগার বিষয় একটাই ছিলো যে আমি কিছু করতে পারছি। ভালো লাগার আরো একটা বিষয় ছিলো যে এত বড় একটা দুর্ঘটনা আমরা অনেক ভালো করেই ম্যানেজ করতে পেরেছি যদি আরো একটু গুছিয়ে, সমন্বয় করে করতে পারতাম। আর যেন এরকম না ঘটে সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যদি গ্রহণ করা হতো!!!

মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৩

ভালোবাসার তত্ত্বকথা


              

সম্প্রতি একটা বই পড়লাম ‘The Psychology of Love’. বইটিতে ভালোবাসার থিওরী ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে একটা থিওরী বেশ আকর্ষণীয় লাগলো। বন্ধুদের সাথে শেয়ার করার জন্যই লেখার উদ্যোগ নিলাম। স্টার্ণবার্গ তার ভালোবাসার ত্রিভুজ তত্ত্বে ভালোবাসার তিনটি উপাদানের কথা বলেছেন। ঘনিষ্ঠতা, প্যাশন এবং সিদ্ধান্ত/কমিটমেন্ট- এর সমন্বয়েই নাকি তৈরী হয় ভালোবাসা। তবে প্রতিটি উপাদানেরই নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন ঘনিষ্ঠতা উপাদানের ভিতরে আবেগ, অনুভুতি, উষ্ণতা, ভালোবাসার বন্ধন এই বিষয়গুলো রয়েছে। প্যাশন ব্যাক্তিকে আবেগ তাড়িত করে যা কিনা রোমান্টিক অনুভূতি, শারীরিক আকর্ষন, যৌন সম্পর্ক এই বিষয় গুলোকে ধারণ করে। সিদ্ধান্ত বা কমিটমেন্ট একজন ব্যাক্তিকে ভালোবাসা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে এবং ভালোবাসা ধরে রাখার মতো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে সহায়তা করে। এই তিনটি উপাদানের তারতম্যই একটা সম্পর্ক কতখানি স্ট্যাবল হবে, কতখানি নিয়ন্ত্রিত হবে বা কিভাবে মূল্যায়িত হবে তা নির্ধারণ করে। যেমনঃ কোন সম্পর্কে যদি ঘনিষ্ঠতা ও সিদ্ধান্ত/কমিটমেন্ট বেশী থাকে তাহলে সেই সম্পর্ক স্থায়ী হবার সম্ভাবনা অনেক বেশী, আবার শুধু প্যাশন থেকে যে সম্পর্ক তৈরী হয় তা তুলনামূলক ভাবে কম স্থায়ী হতে দেখা যায়। স্টার্ণবার্গ তার এই তিনটি উপাদানকে হেরফের করে ভালোবাসার আটটি ধরনের কথা বলেছেন।

১। যে সব সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা, প্যাশন ও সিদ্ধান্ত/ কমিটমেন্ট কোন কিছুই থাকেনা সেগুলি ভালোবাসা বিহীন (non love) সম্পর্ক। যেমন আমরা দৈনন্দিন জীবনে অনেকের সাথেই প্রয়োজনীয় সম্পর্ক বজায় রাখি।
২। যে সব সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা বেশী কিন্তু প্যাশন বা কমিটমেন্ট কম সেই সম্পর্ক গুলো পছন্দের (liking) আওতায় পড়ে। যেমনঃ বন্ধুত্ব।
৩। প্যাশন যে সম্পর্কে বেশী থাকে কিন্তু ঘনিষ্ঠতা ও কমিটমেন্ট থাকে না সেই সম্পর্ককে মোহ (infatuation) বলে। প্রথম দেখায় প্রেমে পড়া যদিও অনেকের কাছেই আকর্ষনীয় কিন্তু স্টার্ণবার্গ একে মোহ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
৪। যে সম্পর্কে শুধুমাত্র কমিটমেন্ট থাকে কিন্তু ঘনিষ্ঠতা ও প্যাশন কম থাকে তা হলো শূন্য ভালবাসা ( empty love)। পারিবারিক ভাবে আয়োজিত বিয়েতে প্রাথমিক অবস্থায় এটি লক্ষ্য করা যায়।
৫। ঘনিষ্ঠতা ও প্যাশন বেশী থাকে কিন্তু কমিটমেন্ট থাকেনা তা রোমান্টিক ভালোবাসার (romantic love) বৈশিষ্ট্য।
৬। ঘনিষ্ঠতা ও কমিটমেন্ট বেশী থাকে কিন্তু প্যাশন কম থাকে তা অনেকটা সঙ্গীর মতো ভালবাসা (companionate love)।
৭। ঘনিষ্ঠতা কম থাকে কিন্তু প্যাশন ও কমিটমেন্ট বেশী থাকে তা অনেকটা বোকার মত ভালবাসা (fatuous love)। এটা অনেকটা ঝড়ের মতো ভালবাসা। ঘনিষ্ঠতা কম থাকায় সম্পর্কের স্থায়ীত্ব থাকেনা।
৮। যে সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা, প্যাশন ও কমিটমেন্ট সবকিছুই বেশী থাকে তা হলো পরিপুর্ণ ভালবাসা (consummate love). রোমান্টিক ভালোবাসায় আসলে সবাই এইরকম একটা পরিপূর্ণতায় পৌছাতে চায়।

বেশীরভাগ সম্পর্ককেই হয়তো একটি নির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করা যাবেনা। কারণ সম্পর্কের চড়াই উৎরাইয়ে ভালোবাসার উপাদানগুলোর তারতম্যে বিভিন্ন পর্যায় আসতেই পারে! যেমন অল্প বয়সে মোহ (infatuation) অনেক বেশী লক্ষ্য করা যা কিনা সেই চিরন্তন সত্যের মতোই মনে হয়। হুটহাট করে প্রেমে পড়া এবং ছ্যাকা খাওয়া টিন এজারদের ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়। যদিও বলা হয় ভালবাসা হিসাব করে হয়না কিন্তু একটা সম্পর্ক কিভাবে পরিপূর্ণ হতে পারে তার ধারণা হয়তো এই লেখা থেকে পেতে পারি। কারোন শুধু চোখের ভালো লাগাই নয়, একে অপরকে জানা, সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতাও একটা সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদী করতে কত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই থিওরী তা বলে দিচ্ছে!               

সোমবার, ৮ এপ্রিল, ২০১৩

মানসিক রোগ বনাম জ্বিন ভূতের আছর



রিতা একমাস ধরে কথা বলেনা। সারাদিন বোবার মত তাকিয়ে থাকে। একেবারেই চুপ, তাও না হয় সহ্য করা যেত কিন্তু গত পনের দিন সে হাত পা কুকড়ে ঝাকানি শুরু করেছে। একবার শুরু হলে ৫ থেকে ১০ মিনিট চলতে থাকে। শ্বশুরবাড়ীর লোকজন এই অদ্ভূত কান্ড দেখে ভীষন ভয় পেয়েছে। মৃগী রোগ কিনা বোঝার জন্য হাত পা ঝাকানোর সময় জুতা শুকিয়ে দেখা হয়েছে। খারাপ কোন কিছু আছর করেছে কিনা মসজিদের ইমামের পড়াপানি খাইয়ে দেখেছে। এরপরও কাজ না হওয়ায় বাবার বাড়ী পাঠিয়ে দিয়েছে। রিতার বাবা মা থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েও সুরাহা পায়নি। মেয়েকে যে জ্বিনেই ধরেছে সে ধারনা পাকাপোক্ত হয়েছে। নিজ গ্রামের, ভিন গ্রামের পীর-ফকির, কবিরাজ সবার কাছেই ছুটোছুটি করেছেন মেয়েকে নিয়ে। রিতার বয়স আঠারো চলছে। দুই বছর ধরে বিয়ে হয়েছে, তার অমতে। স্বামী বিদেশ থাকত, মাসখানেক ধরে দেশে এসেছে। জ্বিনে ধরা বউ নিয়ে তো আর সংসার চলেনা তাই নতুন করে পাত্রী দেখা হচ্ছে।
রিতার সাথে আমার পরিচয় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটে। অনেক পথ পাড়ী দিয়ে তার এই হাসপাতালে আসা। পানিপড়াসহ ওঝা ফকিরের লাঞ্জনাও সহ্য করতে হয়েছে। তখনও সে কথা বলেনা এবং হাত পাগুলোকে অদ্ভূতভাবে ঝাকায়। রিতা কনভারসন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ছিলো যার প্রচলিত নাম হিস্টিরিয়া। এক ধরনের মানসিক রোগ। সাইকোথেরাপী যেখানে চমতকার কাজ করে। রিতা একসপ্তাহের মধ্যেই সাইকোলজিস্টের সাথে কথা বলে। সে ছোটবেলা থেকেই নানুর বাসায় মানুষ। বাবার আর্থিক অবস্থা অত খারাপ না, সুযোগ সুবিধা বেশী বলে নানুর বাসায়ই থাকা হত। ক্লাস টেনে ওঠার পর এই বিয়ের প্রস্তাবটি আসে। ছেলে বিদেশ থাকে, অনেক পয়সা কামাই করে, টাউনে নিজেদের বাড়ী আছে। পাত্রপক্ষের এত আগ্রহ দেখে রিতার মামারা রাজী হয়ে যায়। রিতার মতামত কেউ জানার প্রয়োজন মনে করেনা। বিয়ের পর রিতা বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলো যতটা আগ্রহ দেখিয়ে তাকে বিয়ে করিয়ে আনা হয়েছে বিয়ের পর তার বিন্দুমাত্র লক্ষণ নেই। ছোটখাট বিষয়ে তাকে কথা শোনানো হয়। বিয়ের পরপরই স্বামী বিদেশ চলে যায়। রিতার শ্বাশুড়ী তার স্বামীর সৎ মা, নানান ছুতায় তাকে অপমান করেন। কাজকর্মে অদক্ষতার জন্য পদেপদে ভুল ধরা হয়। রিতা কোন কথা বললে তা আবার ব্যাঙ্গ করে তাকে শোনানো হয়। স্বামী ফোন করে শুধু তার পরিবারের লোকজনদের সাথেই কথা বলেন। রিতার অনুভূতির কোন মূল্য দেয়া হয়না। পড়াশুনা চালিয়ে না যাতে পারার দুঃখ আর এত আগ্রহের বিয়ের এই ফলাফল, বিভিন্ন সময়ে অপমানিত হবার অভিজ্ঞতা রিতার ভিতরে ভিতরে তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি করে। যার বহিঃপ্রকাশ শারীরিক এই লক্ষণের মাধ্যমে ঘটে, কথা বন্ধ হয়ে যায়। হিস্টিরিয়ার বা কনভার্সন ডিসঅর্ডারের মূল কারণটাই হলো মানসিক কোন দ্বন্দ্ব যা ব্যাক্তির মনে অসচেতনভাবে কাজ করে এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সাইকোথেরাপী মূলতঃ এই মানসিক দ্বন্দ্বটাই আবিস্কার করে। মানসিক চাপ কমে গেলে শারীরিক লক্ষণগুলো কমে আসে। যেমন সাইকোথেরাপীর কয়েকটি সেশনের পর রিতার শারীরিক লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে কমে আসে। রিতার কোন শারীরিক সমস্যা ছিলোনা, সমস্যাটা পুরোপুরি মানসিক কিন্তু রিতার মতো অনেকেই এরকম জ্বিন ভূতের আছর সংক্রান্ত ভুল ধারণার শিকার হয়। জ্বিন ভূতের আছর তাড়ানোর নামে চলে অপচিকিতসা। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে মানসিক রোগগুলোর বিচিত্র লক্ষণসমূহ। শুধুমাত্র কনভারশন ডিসঅর্ডারেই এত ধরনের লক্ষণ দেখা যায় আর সেগুলো এতই অদ্ভূত যে তা মানসিক রোগ হিসাবে সাধারণের বোঝা সত্যি দুরূহ। তাছাড়া আমাদের সমাজে মানসিক রোগ সম্পর্কে রয়েছে নেতিবাচক ধারনা। মানসিক রোগ মানেই মনে করাই পাগল। মানসিক রোগ সম্পর্কে রয়েছে নানা রকম কুসংস্কার। এই কুসংস্কার দূর করার জন্য চাই যথাযথ পদক্ষেপ। মানসিক রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপুর্ণ উপায় হতে পারে পাঠ্যবইতে কিছু প্রচলিত মানসিক রোগের ধারণার অন্তর্ভূক্তি। প্রাথমিক শিক্ষায় শারীরিক রোগগুলোর মতো মানসিক রোগগুলোকেও পরিচয় করিয়ে দিলে মানুষ অনেক ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুক্তি পাবে।

বুধবার, ৩ এপ্রিল, ২০১৩

ভুল বোঝা নয় ভুল্ভাবে বোঝার কথা বলছি!!!

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিনিয়তই নানান ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনাগুলোকে আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করি বা নিজেদের মতো করে বুঝে নেই। পরিস্থিতিগুলো হয়তো এমন হয় যে, আমাদের মনে হয় আমরা যা চিন্তা করছি তার বিকল্প কিছু হতেই পারেনা। আমি যা ভাবছি তাই ঠিক - আমাকে বোঝানোর দরকার নেই, এরকমই আমরা মনে করি। আপাতদৃষ্টিতে সঠিক বলে মনে হয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নয় এইরকম চিন্তার ধরনগুলোকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ' distorted cognition’ বা চিন্তনের বিচ্যুতি। জ্ঞানীয় বা চিন্তনের বিচ্যুতি সাধারণত আমাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব তৈরী করে এবং এগুলো স্বাভাবিক চিন্তারই অতিরিক্ত বা অযৌক্তিক বহিঃপ্রকাশ। যেমন, কেউ হয়তো পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করল, সে কারনে মনে করলো ‘আমি আসলে অপদার্থ, আমাকে দিয়ে কিছুই হবেনা’।  বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হলেও এখানে ব্যক্তি প্রথমতঃ নিজেকে একটি মার্কা মেরে দিলো যে আসলে সে অপদার্থ এবং ফলাফল খারাপ করার বিষয়টি সে সবক্ষেত্রে প্রয়গ করল যে তার দ্বারা কিছুই হবেনা। এ ধরনের চিন্তাগুলোই মানুষের জীবনের স্বাভাবিক বিকাশের অন্তরায়। যার ফলে মানুষ পদেপদে পিছিয়ে পড়ে। এ রকমই কিছু বিচ্যুত চিন্তা বা ভুলভাবে বোঝার ধরন মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাখ্যা করা হলোঃ

১। হয় সব নাহলে না, হয় সাদা নয় কালোঃ এক্ষেত্রে ব্যক্তি যে কোন বিষয়বস্তু, ঘটনা অথবা অন্যদের সম্পর্কে মূল্যায়ন শুধুমাত্র দুইভাবে করে। যার ফলে প্রেক্ষাপটটির সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব হয় না। যেমনঃ অনেক শিক্ষার্থী মনে করে যদি তারা পরীক্ষায় প্রথম না হয় তাহলে তারা খারাপ ছাত্র, বা অন্যদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যদি ব্যক্তিটি ভালো না হয় তাহলে নিশ্চয়ই খারাপ।কিন্তু পরীক্ষায় প্রথম না হলেই যেমন কেউ খারাপ ছাত্র হয়ে যায়না তেমনি কেউ ভালো নয় মানেই যে সে খারাপ তাও সঠিক নয়। এ ধরনের বিচুতিতে ব্যাক্তি চিন্তার ক্ষেত্রে চরমপন্থি হয়।

২। তিলকে তাল করা বা ভাগ্য অনুমান করাঃ এক্ষেত্রে যে কোন ঘটনাকে বড়ো করে দেখা হয় ঘটনা সম্পর্কে নেতিবাচক ভবিষ্যতবাণী করা হয়। যেমন কেউ হয়তো কাউকে মনের কথা জানিয়ে সাড়া পেলোনা তখন সে মনে করলো ‘আমাকে আসলে কেউ ভালোবাসেনা। আমি সারাজীবনই কষ্ট পাবো, এরকম অপমানিত হবো।

৩। নিজের ভালো দিককে গুরুত্ব না দেয়াঃ ব্যক্তি তার ভালো গুণ, দক্ষতা, কাজ বা অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করেনা। এ ধরনের কথাগুলোই তার উদাহরণ ‘ইংলিশে  পেয়েছি আমি ভালো ছাত্র বলে যে তা না, সেদিন প্রশ্ন সহজ হয়েছিল’ বা ‘ রান্না ভালো করি তো কি হয়েছে এটা তো সবাই পারে’ ইত্যাদি।

৪। আবেগীয় পক্ষপাতিত্বঃ ব্যক্তি আবেগীয়ভাবে এমন কোন ধারণার বশবর্তী হয় যা কিনা সত্যি নয় অথবা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যেমন, অনেকেই অভিযোগ করেন যে ‘কোন কাজ করতে গেলেই মনে হয় আমি পারবনা। আমি আসলে কোন কাজের না’। অথচ কাজে নামিয়ে দিলে তারা তা ভালোভাবেই সম্পাদন করতে পারে।

৫।মার্কা লাগিয়ে নেয়া বা দেয়াঃ ব্যক্তি নিজের সম্পর্কে বা অন্যদের সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট মার্কা এঁটে দেয়। যেমন, অযোগ্য, অপদার্থ, অলস, কুঁড়ে, বাচাল, অমিশুক ইত্যাদি।

৬। উপসংহারে পৌছে যাওয়াঃ যে কোন একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একেবারে সেই বিষয়ের উপসংহারে পৌছানো। যেমন, ‘ আজকে যে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিলো তা আমার হাজবেন্ড ভুলেই গেছে। ও আসলে আমকে ভালোইবাসেনা’।

৭। নির্বাচিত বিষয়ই দেখাঃ ব্যক্তি শুধু সেই বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হয় যা তার মতামতের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ কিন্তু সমগ্র ঘটনাটি বিবেচনা করে না। যেমন, অংকে পাওয়াটাই প্রমাণ করে যে আমার যোগ্যতা কতটুকু। অংকই তো আসল বিষয়। আর তাতেই ভালো করি নাই’।

৮। অন্যেরা কি মনে করবে তা বুঝে নেওয়াঃ এক্ষেত্রে অন্যেরা কি মনে করেছে বা কি মনে করবে ব্যক্তি নিজেই ঠিক করে নেয়। যেমন, আমি যদি তার কাছে ধার চাই তাহলে আমাকে নিশ্চয়ই আমাকে হ্যাংলা মনে করবে’। 

৯। অতিরিক্ত সাধারনীকরণঃ ব্যক্তি যে কোন একটি ঘটনাকে ধরে ফলাফলকে সবক্ষেত্রেই প্রয়োগ করে। যেমন, ‘ দিবা সেদিন মার্কেটে আমাকে দেখেও কথা বলেনি, ইচ্ছে করে এড়িয়ে গেছে। সবাই আমাকে এড়িয়ে যেতে চায়। কেউ আমাকে পছন্দ করেনা।আমার কোথাও না যাওয়াই ভালো।টিচাররাও আমাকে পছন্দ করেনা। যেদিন পড়া পারিনা সেইদিনই ধরে’।

১০। নিজের উপর নেয়াঃ ব্যক্তি মনে করে সবাই শুধু তার সাথে খারাপ আচরণ করে বা যে কোন ঘটনার জন্যই নিজেকে দায়ী করে। যেমন, ‘বস যে মিটিংএ কথাগুলো বলছিলেন আসলে আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলছিলেন।কাজটাতো আমার জন্যই ভালো করে শেষ হয়নি।আমাকে বোঝানোর জন্যই বলেছেন’।

১১। করা উচিত ছিল বা করতেই হবে এমন বিবৃতিঃ যে কোন বিষয়েই অনেক বেশি রিজিড থাকে। আমার ভালো করা উচিত বা আমাকে ভালো করতেই হবে – মতামতগুলো এই ধরনের হয়। যার ফলে অনেক বেশী চাপের মধ্যে থাকে এবং প্রত্যাশা পূরণ না হলে ভেঙ্গে পড়ে।

১২। সংকীর্ণভাবে দেখাঃ যে কোন পরিস্থিতিতে ব্যক্তি শুধু খারাপ দিকগুলোই দেখে।যেমন, ‘আমার স্ত্রী কোন কাজই ঠিকমতো করতে পারেনা, না রান্না করতে পারে, না বাচ্চাদের যত্ন নিতে পারে’। 

১৩। দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোঃ ব্যক্তি তার যাবতীয় সমস্যার জন্য অন্যদেরকে দায়ী মনে করে এবং সে কারণে সেভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে। যেমন, ‘তোমার কারণে আজকে আমার এই অবস্থা। সবকিছুর পেছনে তুমিই দায়ী’।

১৪। পরিবর্তনের দুরাশাঃ ব্যক্তি আশা করে অন্যেরা তার চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তিত হবে। তারা অন্যদের পরিবর্তন করতে চায় কারণ তাদের ভালো থাকার অনুভূতি অন্যদের উপর নির্ভরশীল।যেমন অনেক সময় আমরা আমাদের পছন্দের মানুষটিকে তার নিজস্বতাকে ভুলে গিয়ে নিজেদের মতো গড়েপিটে নিতে চাই। আর সেরকম না হলেই হয় মনোমালিন্য।

এই জাতীয় চিন্তনের বিচ্যুতিগুলো আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে ব্যহত করে, আমাদের সম্পর্কগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।এরকম ভুলভাবে বোঝার পরিমাণ যদি বেশী হয় তাহলে তা মানসিক সমস্যা তৈরী করে। যেমনঃ বিষন্নতা, সামাজিক উদ্বেগ বা ভীতি প্রভৃতি। সুতরাং আমরা যদি নিজেদের চিন্তাভাবনার গতিপথগুলোকে যাচাই করে সংশোধিত করে নিতে পারি তাহলে আমাদের জীবন আরো সহজ ও সাবলীল হয়ে উঠবে।